মোঃ আল-আমিন
নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক ভোরের হাওয়া
পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি আত্মত্যাগ, তাকওয়া, মানবতা ও মহান রবের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের এক মহাসম্মিলন। ‘ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত’—এই শাশ্বত বাণী কেবল পশু কোরবানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর অন্তর্নিহিত দর্শন হলো নিজের ভেতরের পশুত্বকে বিসর্জন দেওয়া।
মানব ইতিহাসে হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর সেই অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগ আজও আমাদের আলোড়িত করে। আল-কোরআনের সেই অমোঘ ঘোষণা—‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না পশুর গোশত বা রক্ত; পৌঁছায় কেবল তোমাদের তাকওয়া’—আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, কোরবানি কোনো বাহ্যিক প্রদর্শনী নয়, বরং আত্মশুদ্ধির এক অনন্য ইবাদত।
ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে কোরবানির তাৎপর্য একেক অঞ্চলে একেক রূপ পায়। আরব বিশ্বে এটি যেমন সামষ্টিক ভ্রাতৃত্বের প্রতীক, পাশ্চাত্য সমাজে এটি তেমনই ধর্মীয় পরিচয় ধরে রাখার এক শক্ত অবলম্বন। সেখানে নাগরিক নিয়ম-নীতি ও পরিবেশগত সচেতনতা মেনে কোরবানি পালন করা হয়, যা বিশ্ববাসীকে ইসলামের শৃঙ্খলার এক দৃষ্টান্ত দেখায়।
অন্যদিকে, আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটটি আবেগ ও অর্থনীতির এক অসাধারণ মিশেল। গ্রামে গরু লালন-পালনের যত্ন থেকে শুরু করে শহরের ব্যস্ত হাটে পশু কেনা—এই সবকিছুই বাঙালি মুসলিম জীবনের ঐতিহ্যের অংশ। তবে বর্তমান সময়ে নগরায়ণ ও প্রযুক্তির উৎকর্ষে কোরবানির ধরনে যে ডিজিটাল পরিবর্তন এসেছে, তা আমাদের জীবনকে সহজ করলেও অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক নিবিড়তা কমিয়ে দিচ্ছে। একে আমাদের সযত্নে রক্ষা করতে হবে।
ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতিতে যে বিশাল চাকা ঘোরে, তা আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড। কিন্তু এখানেও আমাদের চোখ খুলতে হবে। হাটের চাঁদাবাজি, চামড়ার সঠিক মূল্য না পাওয়া কিংবা অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—এই চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের উন্নয়নের পথে বড় বাধা। যখন কোরবানি সামাজিক প্রতিযোগিতার অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন সেটি ইসলামের মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। অপচয় নয়, বরং ন্যায়বিচার ও সঠিক বণ্টনের মাধ্যমেই কোরবানির প্রকৃত সুফল সবার কাছে পৌঁছাতে পারে।
আজকের এই অস্থির পৃথিবীতে যেখানে যুদ্ধ ও বৈষম্য প্রকট, সেখানে ঈদুল আজহার শিক্ষা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র—সকল ক্ষেত্রেই যদি আমরা আমাদের লোভ, দুর্নীতি ও অন্যায় বিসর্জন দিতে পারি, তবেই কোরবানির প্রকৃত সার্থকতা অর্জিত হবে।
পবিত্র ঈদুল আজহা আমাদের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে বয়ে আনুক প্রকৃত ত্যাগের শিক্ষা ও অনাবিল শান্তি। আমাদের প্রত্যাশা, আগামী দিনের বাংলাদেশ হোক আরও মানবিক, আরও সচেতন।
ঈদ মোবারক।
Leave a Reply